প্রাচীনকালে আসামের লোকেরা কীভাবে ভূত তাড়াতো, তা জানুন।

অসমীয়া লোকবিশ্বাসে কোন আত্মার কী লক্ষণ, কোন মন্ত্রগ্রন্থ, কোন পদ্ধতি, ওঝার কৌশল ও মন্ত্রপূত সুতোর কথা বলা হয়েছে, জানুন।

আত্মা তাড়ানোর মন্ত্র ও অসমীয়া লোকাচার: Incantations and Expulsion of Spirits

লেখকের বিবরণ অনুযায়ী অসমীয়া লোকবিশ্বাসে কেউ অসুস্থ বা অস্বাভাবিক আচরণ করলে তার কারণ হিসেবে কোনো আত্মার ভর ধরা হত। তখন ওঝার (exorcist) সাহায্যে আত্মা তাড়ানোর মন্ত্র ও নানা আচারের আশ্রয় নেওয়া হত। ইংরেজিতে লেখা "Incantations and Expulsion of Spirits" অংশটিতে লেখক প্রথমে কয়েকটি আত্মার আক্রমণের লক্ষণ জানিয়েছেন। তারপর বলেছেন মন্ত্রগ্রন্থ, ভূত ছাড়ানোর দশটি পদ্ধতি, মন্ত্রপূত সুতো, ঘুম পাড়ানোর মন্ত্র আর মন্ত্রপূত চাবুকের কথা। ওঝার নাম শুনে আত্মা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, সে বিবরণও এতে আছে। লক্ষণের তালিকায় লেখক সব আত্মার নয়, কেবল কয়েকটির কথা বলেছেন। এই লেখায় সেই বিবরণ ধরে ধরে সাজানো হল। এগুলো প্রচলিত লোকবিশ্বাসের বিবরণ মাত্র। এর কোনোটিই চিকিৎসার পরামর্শ নয়, প্রমাণিত অতিপ্রাকৃত ঘটনার দাবিও নয়।

অসমীয়া লোকবিশ্বাসে ভূত তাড়ানোর মন্ত্র ও আচার নিয়ে তৈরি সিনেম্যাটিক হরর থাম্বনেইল, যেখানে একজন অসমীয়া ওঝাকে আগুনের সামনে মন্ত্রপূত আচার করতে দেখা যাচ্ছে এবং পেছনে রয়েছে রহস্যময় ভূতের ছায়া। ছবিতে বাংলা লেখা “ভূত তাড়ানোর মন্ত্র ও অসমীয়া লোকাচার” এবং ইংরেজি লেখা “Incantation and Explosion of Spirits” রয়েছে।
প্রাচীনকালে আসামের লোকেরা কীভাবে ভূত তাড়াতো, তা জানুন।

১. বিভিন্ন আত্মার দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ

লেখক শুরুতেই জানিয়েছেন, মন্ত্রের কথায় যাওয়ার আগে তিনি "কয়েকটি" আত্মার আবেশের লক্ষণ বলে নেবেন। অর্থাৎ তালিকাটি সব আত্মার নয়, বাছাই করা কয়েকটির। প্রতিটি লক্ষণ লোকবিশ্বাসে আত্মার প্রভাব হিসেবে বর্ণিত, কোনো চিকিৎসাগত রোগনির্ণয় নয়।

১.১ পেরেত (Peret)

পেরেতের কবলে পড়লে শিকারের শরীরে চুলকানি, ফোঁড়া ইত্যাদি দেখা দেয়। এর বদলে তার কোয়ার্টান (quartan) জ্বরের আক্রমণও হতে পারে। এটি পর্যায়ক্রমে ফিরে আসা জ্বরের একটি ধরন।

১.২ চমন (Chamon)

চমনের আবেশে শিকারের চোখ হলুদ হয়ে যায় এবং মুখ লাল হয়ে ওঠে। (এই সোর্সে বানান "Chamon"; এই আত্মার আগের আলোচনায় "chaman" বানানও এসেছে।)

১.৩ অলাখনি (Alakhani)

লেখক অলাখনির লক্ষণ আলাদা দু'জায়গায় বলেছেন, আর দুটি বিবরণ আলাদা। প্রথমটিতে শিকারের পেটে যন্ত্রণাদায়ক ব্যথার অনুভূতি হয়। দ্বিতীয় বিবরণ আরও নির্দিষ্ট: শিকারের মনে হয় একটি পাথর যেন পেট থেকে ঠেলে হৃদয়ের দিকে উঠে আসছে, আর সে ভীষণ কষ্ট পায়। পুরুষ অলাখনি আবিষ্ট করলে লোকটি যন্ত্রণায় কিছুক্ষণের জন্য প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে।

১.৪ বুড়া-ডাংগরিয়া (Bura-Dangaria)

এর আবেশে শিকারের মাথা, বুক, কোমর ও হাত-পায়ে ব্যথা হয়। ব্যথা এত তীব্র যে লোকটির সামনে নুয়ে পড়ার (stoop) ক্ষমতাই থাকে না।

১.৫ খেতার (Khetar)

আক্রান্ত শিশুর খিঁচুনি হয়। পুরুষ খেতার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকেও আবিষ্ট করে, আর সেটা ঘটে ঘুমের মধ্যে। তখন লোকটি গোঙাতে থাকে এবং কষ্টের শব্দ করে।

১.৬ প্রসূতা (Prasuta)

শিকার এখানে গর্ভবতী নারী। তার জ্বর আসে, হাত-পা ফুলে যায় এবং সবসময় ঘুম-ঘুম ভাব থাকে। লেখকের কথায়, প্রসূতার আবেশে থাকা নারী আরও কিছু যন্ত্রণাদায়ক উপসর্গেও ভোগে, তবে সেগুলো তিনি আলাদা করে বলেননি।

১.৭ দাতিয়াল বা জনকাখরিয়া (Datial or Jankakharia)

শিকারের খুব উঁচু জ্বর আসে, সঙ্গে দুই রগে (both temples) টনটনে ব্যথা। এই অবস্থা দশ দিন বা তার কাছাকাছি সময় ধরে চলতে পারে।

১.৮ পানিমঙ্গলী (Panimangali)

আবিষ্ট মানুষটির চোখ লাল হয়ে যায়। সে নির্বোধের মতো আচরণ করে, হাত দিয়ে লক্ষ্যহীনভাবে কিছু আঁকড়ে ধরতে চায় এবং ঝাঁট দেওয়া জঞ্জাল, ছেঁড়া কাপড়, ধুলো ইত্যাদি নিয়ে খেলতে থাকে।

১.৯ ভূত (Bhoot)

ভূতের আবেশে শিকারের তীব্র জ্বর হয়।

২. আত্মা তাড়ানোর মন্ত্রগ্রন্থ

২.১ প্রথম তালিকার ছয়টি মন্ত্রগ্রন্থ

লক্ষণের কথা বলার পর লেখক আত্মা তাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত ছয়টি মন্ত্রগ্রন্থের নাম করেছেন: করসালা বান (Karsala Ban), বিষ্ণু বান (Bishnu Ban), সারিয়া বান (Sariah Ban), খের বান (Kher Ban), রুদ্র বান (Rudra Ban) ও চক্র বান (Chakra Ban)। বান শব্দের অর্থ তির। পরে বর্ণিত কয়েকটি পদ্ধতির নামেই তা বোঝা যায়, যেমন "গুবরে পোকার তির" বা "সরষের তির"।

২.২ জরুরি অবস্থার সংক্ষিপ্ত মন্ত্র: দিখা (Dikha)

জরুরি অবস্থায় ওঝা দীর্ঘ মন্ত্রের বদলে শুধু দিখা (dikha) নামে ছোট মন্ত্র ব্যবহার করেন। লেখক যে দিখাগুলোর নাম দিয়েছেন: শনি দিখা (Sani Dikha), কাল দিখা (Kal Dikha), রুদ্র দিখা (Rudra Dikha), নরসিংহ দিখদা (Nara Singha Dikhda) ও ব্রহ্ম দিখা (Brahma Dikha)।

২.৩ আত্মা তাড়ানোর অন্যান্য মন্ত্রগ্রন্থ

লেখক আত্মা তাড়ানোর প্রধান মন্ত্রগ্রন্থের আরও একটি তালিকা দিয়েছেন। তাতে রয়েছে: আদি নরসিংহ (Adi Nara Singha), চৌসষ্টি নরসিংহ (Chausasthi Nara Singha), অজপা নরসিংহ (Ajapa Nara Singha), বালিয়া নরসিংহ (Balia Nara Singha), সমুদাই (Samudai), পক্ষীরাজ (Pakshiraj), গরুড়ি (Garuri), বেলাহি বেজিনি (Belahi Bejini), গর্ভ-ধারণ (Garbha-Dharan), কাঞ্চন (Kanchan), কলাপ (Kalap) ও পানি বেজিনি (Pani Bejini)। অর্থাৎ মোট বারোটি গ্রন্থ। সোর্সে এগুলোর বিষয়বস্তু বা ব্যবহারবিধি আলাদা করে বলা হয়নি।

৩. আত্মা তাড়ানোর দশটি পদ্ধতি

লেখক বলেছেন, উপরের মন্ত্রগ্রন্থ ধরে ধরে তিনি আত্মা তাড়ানোর কয়েকটি পদ্ধতি বর্ণনা করবেন। তাঁর দেওয়া তালিকায় দশটি পদ্ধতি আছে, (a) থেকে (j) চিহ্নে। নিচে প্রতিটি পদ্ধতির ফল, অর্থাৎ আত্মার চলে যাওয়া, লেখকের বর্ণনা অনুযায়ীই বলা হয়েছে। লক্ষণীয়, গুবারুয়া বান, অগ্নি বান, জল বান ও খারিকা বান প্রথম ছয় গ্রন্থের তালিকায় ছিল না। অথচ সেগুলোও এই দশের মধ্যে বর্ণিত।

৩.১ করসালা বান (Karsala Ban)

করসালা (Karsala) এক ধরনের ঘাস। লেখকের বিবরণ অনুযায়ী ওই ঘাস যথাবিধি মন্ত্রপূত করা হয়। তারপর তা দিয়ে আবিষ্ট মানুষটিকে আঘাত করা হয়। এতে আত্মা পিছু হটে। (সোর্সে একবার বানান "Karsala Bam" ছাপা হয়েছে, যা সম্ভবত ছাপার ভুল।)

৩.২ গুবারুয়া বান (Gubarua Ban)

নামের আক্ষরিক অর্থ "গুবরে পোকার তির" (beetle arrow)। তিনটি গুবরে পোকা মেরে পিষে গুঁড়ো করা হয়। সেই গুঁড়ো সরষের তেল ও ক্ষারীয় জলের (alkaline water) সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে মেশানো হয়। এই মিশ্রণ আবিষ্ট মানুষের শরীরে ছিটিয়ে দিলে আত্মা বিতাড়িত হয়, এমনই বলা হয়েছে।

৩.৩ অগ্নি বান (Agni Ban)

নামের অর্থ "আগুনের তির" (fire arrow)। তিতাবহাক (titabahak) গাছের ডাল দিয়ে একটি মশাল তৈরি করে তার শিখা উঁচু করে ধরা হয়। তারপর আগুনের ওপর এমনভাবে সরষের দানা ছড়ানো হয় যে স্ফুলিঙ্গ ছিটকে আবিষ্ট মানুষের গায়ে পড়ে। এই সময় সারাক্ষণ প্রচলিত মন্ত্র আওড়ানো হয়।

৩.৪ জল বান (Jal Ban)

নামের অর্থ "জলের তির" (water arrow)। শুকনো কলাপাতার মধ্যশিরা পুড়িয়ে ছাই করা হয়। সেই ছাই মেশানো হয় কিছুটা হুঁকোর জলে (hubble-bubble water)। যথাযথ মন্ত্রসহ এই মিশ্রণ আবিষ্ট মানুষের চোখে ছিটিয়ে দিলে আত্মা সরে যায়, লেখক এমনই বলছেন।

৩.৫ খারিকা বান (Kharika Ban)

নামের অর্থ "ছাউনির ঘাসের তির" (arrow of thatching grass)। কিছুটা ছাউনির ঘাস মন্ত্রপূত করে আবিষ্ট মানুষের গায়ে ছুড়ে মারা হয়। তখন আত্মা পালিয়ে যায়।

৩.৬ বিষ্ণু বান (Bishnu Ban)

রসুন, পেঁয়াজ এবং আরও কিছু ঔষধি শিকড় গুঁড়ো করে সরষের তেল ও জলে মেশানো হয়। কোন কোন শিকড়, তা সোর্সে বলা নেই। যথাযথ মন্ত্র পড়ে এই মিশ্রণ আবিষ্ট মানুষের গায়ে ছিটানো হয়। তখন আত্মা শিকারকে ছেড়ে নিজের আস্তানায় ফিরে যায়।

৩.৭ সারিয়া বান (Sariah Ban)

নামের অর্থ "সরষের তির" (mustard arrow)। ওঝা মুখে কিছুটা সরষের দানা নেন। আবিষ্ট মানুষের সামনে একটি চালুনি ধরা থাকে। ওঝা মন্ত্র আওড়াতে আওড়াতে সেই চালুনির মধ্য দিয়ে সরষের দানা তার দিকে ফুঁ দিয়ে ছড়িয়ে দেন। গায়ে পড়া সরষে জ্বালাপোড়ার অনুভূতি জাগায়, আর সেই যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মা শিকারকে ছেড়ে যায়।

৩.৮ খের বান (Kher Ban)

নামের অর্থ "খড়ের তির" (straw arrow)। কিছুটা খড় যথাবিধি মন্ত্রপূত করে আবিষ্ট মানুষের দিকে ছোড়া হয়। সেই খড় গায়ে লাগামাত্র আত্মা প্রাণ নিয়ে পালায়।

৩.৯ রুদ্র বান (Rudra Ban)

সরষের দানা, অরিস (orris) এবং আরও কিছু ঔষধি শিকড় গুঁড়ো করে সরষের তেলে মিশিয়ে পাতলা করা হয়। এই মিশ্রণ আবিষ্ট মানুষের চোখে ছিটালে আত্মা যেখান থেকে এসেছিল, সেখানেই ফিরে যায়।

৩.১০ চক্র বান (Chakra Ban)

লেখকের মতে চক্র বানের পদ্ধতি মোটামুটি আগে বর্ণিত পদ্ধতির মতোই। তিনি এর আলাদা বিস্তারিত বিবরণ দেননি।

একটি স্পষ্টীকরণ: এই পদ্ধতিগুলোতে আগুন, পোকা, চোখে ছিটানো মিশ্রণ আর অচেনা উপাদানের কথা আছে। সবই লেখকের বিবরণ ও লোকবিশ্বাস। এগুলো নিরাপদ বা কার্যকর বলে প্রমাণিত নয়, আর কাউকে এভাবে "চিকিৎসা" করার উদ্দেশ্যে লেখা নয়। জ্বর, ব্যথা বা অন্য কোনো শারীরিক লক্ষণে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়াই একমাত্র নিরাপদ পথ।

৪. খেতার তাড়ানোর বিশেষ আচার ও মন্ত্রপূত সুতো

নারীর শরীর থেকে খেতার তাড়ানোর জন্য লেখক একটি আলাদা "ওষুধ"-এর কথা বলেছেন। এটি তৈরির সময় সারাক্ষণ যথাযথ মন্ত্র আওড়ানো হয়।

৪.১ চারটি উপাদান

  • সাতটি আলাদা ঘাট থেকে তোলা জল
  • সাতটি আলাদা দোকান থেকে সংগ্রহ করা তেল
  • বেন্ট-গ্রাস (bent-grass)
  • রোদে শুকোনো ধান থেকে তৈরি চাল

৪.২ মন্ত্রপূত সুতো তৈরি

চারটি উপাদান একসঙ্গে মেশানো হয়। তারপর একটি রহস্যময় বা মন্ত্রপূত সুতো (mystic thread) তৈরি করে সেই মিশ্রণে ডুবিয়ে রাখা হয়। আক্রান্ত নারী মিশ্রণটি পান করেন এবং সুতোটি গলায় পরেন। এই আচারের কথা এখানে ঐতিহাসিক লোকবিশ্বাস হিসেবেই বলা হল। অজানা মিশ্রণ পান করা বিপজ্জনক হতে পারে।

৫. শক্তিশালী আত্মা তাড়ানোর বিশেষ পদ্ধতি

কোনো ভয়ংকর বা শক্তিশালী (formidable) আত্মার মোকাবিলা করতে হলে ওঝা অন্য একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন।

৫.১ জিকা ফল, মরিচ ও সরষের ব্যবহার

ওঝা একটি জিকা (jika) ফলের ভেতরে লঙ্কার বীজ ও সরষের দানা ভরেন। তারপর মুখের ফুঁয়ে সেগুলো বের করে দেন। এতে আবিষ্ট মানুষটি হাঁচতে থাকে।

এরপর আত্মা সেই মানুষটির মুখ দিয়েই বলে ওঠে, পুজো দিলে সে চলে যেতে রাজি। পুজো দেওয়া হয় এবং আত্মা কথা রেখে লোকটিকে ছেড়ে যায়।

৫.২ হাঁচি: আত্মা-আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ

লেখক এখানে প্রসঙ্গত একটি মন্তব্য করেছেন। তাঁর বর্ণিত এই পদ্ধতিতে যার ওপর আচারটি করা হচ্ছে, তার হাঁচি হওয়াকে আত্মার আবেশের নিশ্চিত লক্ষণ বলে ধরা হয়।

৫.৩ বার-কচু পাতার পরীক্ষা

আবেশ আছে কি না যাচাইয়ের আরও একটি উপায় আছে। মন্ত্রপূত বার-কচু (bar-kachu) গাছের পাতার ওপর শোয়ালে লোকটি অস্থির হয়ে পড়ে। এই অস্থিরতাও আবেশের লক্ষণ।

৫.৪ নাভিতে বেলপাতা চেপে ধরার পরীক্ষা

একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক (সংখ্যাটি সোর্সে বলা নেই) বেলপাতা মানুষটির নাভির ওপর চেপে ধরলে যদি সে অসহ্য ব্যথা পায়, সেটিও আবেশের ইঙ্গিত বলে ধরা হয়।

৬. মুসলমান আত্মা খাবিশ (Khaabish) তাড়ানোর পদ্ধতি

৬.১ খাবিশের পরিচয়

লেখক হিন্দু আত্মাদের কথা বলার পর জানাচ্ছেন, খাবিশ (khaabish) একটি মুসলমান আত্মা, তবে তাকেও মাঝে মাঝে কোনো মানুষকে আবিষ্ট করতে দেখা যায়। লেখকের বক্তব্য, এ কথা তিনি আগেও বলেছেন। (সেই অংশটি এই সোর্সে নেই।)

৬.২ মন্ত্রের শেষে আল্লাহর নাম

এই আত্মা তাড়াতে সাধারণ হিন্দু মন্ত্রই ব্যবহার করা হয়। শুধু একটি ব্যতিক্রম: প্রতিটি স্তবকের শেষে হিন্দু দেবতার নামের জায়গায় বসে মুসলমানদের ঈশ্বর আল্লাহর নাম। (লেখক এখানে "Muhammadan divinity" কথাটি ব্যবহার করেছেন, যা তাঁর সময়ের ভাষা।)

৭. মন্ত্রপূত সুতো ও জীবন-মৃত্যুর পূর্বাভাস

মন্ত্রপূত সুতো তৈরির সময় কিছু লক্ষণ দেখে নাকি বোঝা যায়, আবিষ্ট মানুষটি বাঁচবে, না মারা যাবে। লেখক এ ব্যাপারে লোকবিশ্বাসের কথাই বলেছেন।

৭.১ তেল ও জলের মিশ্রণের রং

সুতোয় যে তেল-জলের মিশ্রণ মাখানো (anointed) হয়, সেটি সাদা হয়ে গেলে বলা হয়, লোকটি সেরে উঠবে। কালো হয়ে গেলে সে মারা যাবে।

৭.২ সুতোর দুই প্রান্তের দৈর্ঘ্য

সুতোর ওপরের প্রান্ত নিচের প্রান্তের চেয়ে ছোট দেখা গেলে শিকারের মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত বলে ধরা হয়।

৮. নিদ্রা বান (Nidra-Ban): ঘুম পাড়ানোর মন্ত্র

৮.১ "ঘুম পাড়ানো তির"-এর পরিচয়

আগে উল্লিখিত মন্ত্রগ্রন্থগুলো ছাড়াও আরেকটি বই আছে, নাম নিদ্রা বান (Nidra-Ban), যার অর্থ "ঘুম পাড়ানো তির" (sleeping arrow)। এতে আত্মা তাড়ানোর কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি বর্ণিত নেই।

৮.২ মন্ত্রের উদ্দেশ্য

বইটিতে এমন মন্ত্র আছে, যা আওড়ালে আবিষ্ট মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে। সেই ফাঁকে ওঝা লেখকের ভাষায় "ভূতুড়ে লড়াই" (spectral warfare)-এর প্রস্তুতি নেওয়ার যথেষ্ট সময় পান।

৯. গর্ভবতী নারীর ওপর মারকুছিয়ার (Markuchia) প্রভাব

৯.১ আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ

মারকুছিয়ার আবেশে পড়া গর্ভবতী নারীর জ্বর হয়, শরীরে জ্বালাপোড়া অনুভূত হয় এবং পাতলা পায়খানা হয়। লেখকের বর্ণনায় এর ফলে গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট হয়ে যায়।

৯.২ আত্মা তাড়ানোর পদ্ধতি

যথাযথ মন্ত্র আওড়ালে অথবা মন্ত্রপূত সুতো ব্যবহার করলে নারী সুস্থ হয়ে ওঠেন, লেখক এমনই জানিয়েছেন।

৯.৩ গর্ভাবস্থার তৃতীয় বা পঞ্চম মাস

এই আত্মাকে গর্ভাবস্থার তৃতীয় বা পঞ্চম মাসের মধ্যে তাড়াতে হয়। নইলে তার মারাত্মক কবল থেকে জন্মানো সন্তানদের বাঁচানো কঠিন, লেখক এমনই বলেছেন।

গর্ভাবস্থায় জ্বর বা রক্তক্ষরণের মতো লক্ষণ হলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। উপরের অংশটি শুধুই ঐতিহাসিক লোকবিশ্বাসের বিবরণ।

১০. মন্ত্রপূত চাবুক ও আত্মার স্বীকারোক্তি

১০.১ মন্ত্রপূত চাবুকের বিবরণ

একটি চাবুককে মন্ত্রপূত করে তাকে চলাফেরার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। একজন মানুষ চাবুকটি হাতে ধরে থাকে, কিন্তু সে নিছক একটি যন্ত্র, চাবুকের হুকুমের তাঁবেদার।

১০.২ আত্মার স্বীকারোক্তি

চাবুকটি গিয়ে আবিষ্ট মানুষটিকে নির্দয়ভাবে মারতে থাকে। এই চলে ততক্ষণ, যতক্ষণ না আত্মা সব খুলে বলে: সে কে, কেন সেখানে এসেছে এবং কী চায়।

১০.৩ পুজো ও আত্মার প্রস্থান

উপযুক্ত নৈবেদ্য দেওয়া হলে আত্মা চলে যায় এবং মানুষটি আবার নিজের মতো হয়ে ওঠে। ওঝা আত্মাকে একটি দৃশ্যমান চিহ্ন দেখাতে বলেন, যাতে সবাই নিশ্চিত হয় যে সে সত্যিই চলে গেছে। তখন আত্মা কাছের গাছ থেকে একটি ডাল ভেঙে দেয়, কিংবা ওঝা যে চিহ্নই দেখাতে বলেন, তা-ই দেখায়।

এখানেও লেখক লোকবিশ্বাসের বিবরণই দিয়েছেন। কাউকে এভাবে আঘাত করা যে কোনো পরিস্থিতিতেই বিপজ্জনক।

১১. ওঝার নাম শুনে আত্মার প্রতিক্রিয়া

১১.১ চুলের গোছায় গিঁট

কোনো মানুষকে আত্মা আবিষ্ট করলে তার মাথার একগোছা চুলে গিঁট বাঁধা হয়। এই কাজ যে কেউ, এমনকি সাধারণ কোনো মানুষও, করতে পারে।

১১.২ ওঝার নাম উচ্চারণ

যিনি গিঁট বাঁধেন, তিনি আত্মাকে সম্বোধন করে জানিয়ে দেন, কোন ওঝাকে তিনি ডাকতে চান।

১১.৩ শক্তিশালী ওঝার ভয়

আত্মা যদি বোঝে ওই ওঝা তার পক্ষে অতি শক্তিশালী, তাহলে সে ভয়ে পিছিয়ে যায়, অস্থির হয়ে ওঠে এবং অবিলম্বে সেই ওঝাকে ডেকে আনার জন্য অনুরোধ করতে থাকে।

উপসংহার: অসমীয়া লোকবিশ্বাসে মন্ত্র, আচার ও আত্মা তাড়ানোর ধারণা

এই বিবরণে একটি পুরো ব্যবস্থার ছবি ফুটে ওঠে। প্রথমে আছে আত্মাভেদে আলাদা লক্ষণ: কারও জ্বর, কারও খিঁচুনি, কারও চোখের রং বদল। তারপর আছে মন্ত্রগ্রন্থ, ছোট দিখা আর দশটি পদ্ধতি, যেগুলোয় ঘাস, খড়, সরষে, আগুন ও মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। এর বাইরে আছে খেতার, খাবিশ ও মারকুছিয়ার জন্য আলাদা আচার, মন্ত্রপূত সুতো, ঘুম পাড়ানো নিদ্রা বান আর স্বীকারোক্তি আদায়ের মন্ত্রপূত চাবুক।

আত্মার উপস্থিতি যাচাইয়ের বিশ্বাসও এখানে স্পষ্ট: হাঁচি, বার-কচু পাতা ও বেলপাতার পরীক্ষা। তেমনই প্রস্থান নিশ্চিত করার বিশ্বাস, গাছের ডাল ভাঙার মতো দৃশ্যমান চিহ্ন। বেণুধর রাজখোয়ার গ্রন্থের এই অংশ তাই অসমীয়া লোকবিশ্বাসের একটি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে পড়া যায়। তবে এখানে লিপিবদ্ধ দাবিগুলো প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়। অতিপ্রাকৃত দাবি আর প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে সেই পার্থক্য মনে রেখেই এই বিবরণ পড়া উচিত।


Source

  • বই: Assamese Demonology
  • লেখক: Benudhar Rajkhowa
  • প্রাককথনের স্বাক্ষর: B. R., Shibsagar, October 1904
  • ভূমিকা: W. J. Reid, Kohima, Assam, September 27, 1904
  • Assamese Demonology (Google Books): Assamese Demonology by Benudhar Rajkhowa: A Study of Assamese Folklore and Beliefs
  • Internet Archive
  • Google Books
  • Amazon (যদি কেউ বইটি কিনতে চায়)

Countinue Reading

Releted Articles

অসমের অজানা আত্মা, ভূত ও লোকবিশ্বাস: Assamese Demonology

Other Articles

Black Magic বা কালো জাদু, তন্ত্র-মন্ত্র ও বশীকরণ কি সত্যি? Possession ও Exorcism কী? আত্মা ভর করা ও ঝাড়ফুঁকের ব্যাখ্যা

About the author

Subham Halder
I am the creator and author of True Horror Feed. I researches and writes about true scary stories, paranormal experiences, folklore, urban legends, mythology, and unexplained incidents, with an emphasis on distinguishing documented information from …

Post a Comment

Have you experienced something similar? Tell us below! 👁️